ঈদুল আজহা ২০২২ কত তারিখে বাংলাদেশ & ঈদুল আজহার তাৎপর্য

ঈদুল আজহা ২০২২ কত তারিখে বাংলাদেশ & ঈদুল আজহার তাৎপর্য.ঈদুল আজহা কত তারিখে 2022 – বাংলাদেশে এ বছর ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে কত তা আগে থেকেই নির্ধারিত.

ঈদুল আজহা ২০২২ কত তারিখে বাংলাদেশ

সৌদি আরবের ঈদ ৯ জুলাই শনিবার এবং বাংলাদেশে ২০২২ সালের ঈদুল আজহা শুরু হবে রবিবার, ১০ জুলাই তারিখ হতে পারে.

শনিবার 09 জুলাই 2022 ঈদুল আজহার প্রথম দিন.সৌদি আরব, আমিরাত, ওমান, মিশর, লেভান্ত এবং মাগরেব সহ বেশিরভাগ ইসলামি দেশ 01 জুন বুধবার থেকে যুল-কাদা মাস শুরু করেছে এবং সেই অনুযায়ী, যুল-হিজ্জাহ মাসের অর্ধচন্দ্রাকার তদন্ত করা হবে। ২৯ জুন বুধবার এবং ওই দিন বিশ্বের কোথাও থেকে খালি চোখে অর্ধচন্দ্র দেখা সম্ভব নয়।ইসলামী বিশ্বে পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দূরবীন ব্যবহার করে তা খুব কমই সম্ভব। তদনুসারে, আশা করা হচ্ছে যে 30 জুন বৃহস্পতিবার, অনেক দেশে যুল-হিজ্জাহ মাসের প্রথম দিন হবে এবং সেই শুক্রবার, 8 জুলাই আরাফার ওয়াকফ হবে এবং 9 জুলাই শনিবার, প্রথম দিন হবে। ঈদুল আজহার দিন। 

কিছু আরব এবং ইসলামিক শহরে 29 জুন বুধবার অর্ধচন্দ্রের অবস্থানের জন্য, সূর্যাস্তের সময় অর্ধচন্দ্রের উপরিভাগের গণনা নিম্নরূপ: জাকার্তায়, চাঁদ সূর্যাস্তের 12 মিনিট পরে অস্ত যায়, এর বয়স 9.5 ঘন্টা এবং দৃশ্যমানতা এমনকি টেলিস্কোপ ব্যবহার করেও সম্ভব নয়। আবুধাবিতে, চাঁদ সূর্যাস্তের 31 মিনিট পরে অস্ত যায় এবং এর বয়স 14.2 ঘন্টা। রিয়াদে, চাঁদ সূর্যাস্তের 32 মিনিট পরে অস্ত যায় এবং এর বয়স 14.6 ঘন্টা। আম্মান এবং জেরুজালেমে, চাঁদ সূর্যাস্তের 37 মিনিট পরে অস্ত যায় এবং এর বয়স 15.5 ঘন্টা। কায়রোতে, চাঁদ সূর্যাস্তের 36 মিনিট পরে অস্ত যায় এবং এর বয়স 15.6 ঘন্টা। রাবাতে, চাঁদ সূর্যাস্তের 43 মিনিট পরে অস্ত যায় এবং এর বয়স 17.6 ঘন্টা। এবং আবুধাবি, রিয়াদ, আম্মান, জেরুজালেম, কায়রো এবং রাবাতে দৃষ্টি শুধুমাত্র টেলিস্কোপ ব্যবহার করে সম্ভব, যদিও এটি মধ্যপ্রাচ্যে কঠিন এবং দেখতে সক্ষম হওয়ার জন্য খুব পরিষ্কার আকাশ প্রয়োজন।

এই সংখ্যাগুলির অর্থ জানার জন্য, এটি লক্ষ করা উচিত যে খালি চোখে দেখা যায় এমন একটি অর্ধচন্দ্রের ন্যূনতম সময়কাল ছিল 29 মিনিট এবং খালি চোখে দেখা যায় এমন একটি অর্ধচন্দ্রের সর্বনিম্ন বয়স ছিল 15। ঘন্টা এবং 33 মিনিট, এবং অর্ধচন্দ্রের অবস্থান এবং বয়স এই মানগুলিকে অতিক্রম করার জন্য এটি দেখতে সক্ষম হওয়া যথেষ্ট নয়, কারণ অর্ধচন্দ্র দেখা হচ্ছে এটি অন্যান্য কারণগুলির সাথে সম্পর্কিত যেমন সূর্য থেকে এর কৌণিক দূরত্ব এবং এর এর পর্যবেক্ষণের সময় দিগন্ত থেকে দূরত্ব।

সাধারণের বিপরীতে, অনেক ইসলামিক দেশ তাদের স্থানীয় দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে ধু আল-হিজ্জাহ এবং ঈদুল আযহা মাসের শুরুতে এবং অন্য কোনো দেশকে অনুসরণ করে না, এবং এই দেশগুলির মধ্যে: মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই। , ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইরান, ওমানের সালতানাত, মরক্কো রাজ্য, মৌরিতানিয়া এবং তুরস্ক এবং আফ্রিকার বেশিরভাগ অ-ইসলামিক দেশ আরবি। যেহেতু ২৯শে জুন বুধবার অর্ধচন্দ্র দেখা ইসলামী বিশ্বের পূর্ব দিক থেকে কোনোভাবেই সম্ভব নয় এবং সে সময়ে ইসলামি বিশ্বের কোথাও থেকে খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়, তাই আশা করা যায় পূর্ববর্তী অনেক দেশই এই অর্ধচন্দ্র দেখা দেবে। শুক্রবার, জুলাই 01, জুল-হিজ্জাহ মাসের প্রথম দিন ঘোষণা করুন এবং এটি হবে রবিবার, 10 জুলাই, এই দেশগুলিতে ঈদুল আযহার প্রথম দিন। 

অর্ধচন্দ্র পর্যবেক্ষণের ফলাফল সম্পর্কে জানতে, আপনি ইন্টারনেটে (www.AstronomyCenter.net) ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টারের ইসলামিক ক্রিসেন্ট অবজারভেশন সেন্টারের ওয়েবসাইট দেখতে পারেন, যেখানে প্রকল্পটি 1998 খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং বর্তমানে আরও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিজ্ঞানীদের 1500 জনেরও বেশি সদস্য এবং যারা নতুন চাঁদ দেখতে এবং ক্যালেন্ডার গণনা করতে আগ্রহী। প্রকল্পটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগ্রহী ব্যক্তিদের অর্ধচন্দ্রাকার অনুসন্ধান করতে এবং তাদের পর্যবেক্ষণের ফলাফলগুলি তার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকল্পে পাঠাতে উত্সাহিত করে, যেখানে সেগুলি যাচাই-বাছাই করে পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হয়।

ঈদুল আযহা : গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আদি পিতা আদম (আঃ)-এর দুই পুত্র কাবীল ও হাবীলের দেওয়া কুরবানী থেকেই কুরবানীর ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে। তারপর থেকে বিগত সকল উম্মতের উপর এটা জারী ছিল। আমাদের উপর যে কুরবানীর নিয়ম নির্ধারিত হয়েছে, তা মূলতঃ ইবরাহীম (আঃ) কর্তৃক শিশু পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-কে আল্লাহর রাহে কুরবানী দেওয়ার অনুসরণে ‘সুন্নাতে ইবরাহীমী’ হিসাবে চালু হয়েছে। মক্কা নগরীর জনমানবহীন ‘মিনা’ প্রান্তরে আল্লাহর দুই আত্মনিবেদিত বান্দা ইবরাহীম ও ইসমাঈল আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তুলনাহীন ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, বর্ষপরম্পরায় তারই স্মৃতিচারণ হচ্ছে ‘ঈদুল আযহা’ বা কুরবানীর ঈদ। আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের প্রকৃষ্ট নমুনা এই কুরবানীতে প্রতীয়মান।
পবিত্র কুরআনে কুরবানীর বদলে ‘কুরবান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। হাদীছেও ‘কুরবানী’ শব্দটি ব্যবহৃত না হয়ে এর পরিবর্তে ‘উযহিয়াহ’ ও ‘যাহিয়া’ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আর এজন্যই কুরবানীর ঈদকে ‘ঈদুল আযহা’ বলা হয়। আরবী ‘কুরবান’ শব্দটি ফারসী বা উর্দূতে ‘কুরবানী’ রূপে পরিচিত হয়েছে, যার অর্থ ‘নৈকট্য’। আর পারিভাষিক অর্থে ‘কুরবানী’ ঐ মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাছিল হয়। প্রচলিত অর্থে ঈদুল আযহার দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শারঈ তরীকায় যে পশু যবহ করা হয়, তাকে ‘কুরবানী’ বলা হয়’। সকালে রক্তিম সূর্য উপরে ওঠার সময়ে ‘কুরবানী’ করা হয় বলে এই দিনটিকে ‘ইয়াওমুল আযহা’ বলা হয়ে থাকে। কুরবানী মুসলমানদের জন্য একটি ধর্মীয় ইবাদত। যিলহজ্জ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে এই ইবাদত পালন করতে হয়। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমরা ঈদুল আযহার গুরুত্ব, তাৎপর্য ও শিক্ষার উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।
গুরুত্ব :
ঈদুল আযহার গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন-হাদীছে এ ব্যাপারে যথেষ্ট তাকীদ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُم مِّنْ شَعَائِرِ اللهِ لَكُمْ فِيْهَا خَيْرٌ- ‘আর কুরবানীর পশু সমূহকে আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে’ (হজ্জ ৩৬)। আল্লাহ আরও বলেন, وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيْمٍ- وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِيْنَ-  ‘আর আমরা তাঁর (ইসমাঈলের) পরিবর্তে যবহ করার জন্য দিলাম একটি মহান কুরবানী। আমরা এটিকে পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিলাম’ (ছাফফাত ১০৭-১০৮)। আল্লাহ বলেন, فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ  ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর’ (কাওছার ২)। কাফির-মুশরিকরা তাদের দেব-দেবী ও বিভিন্ন কবর ও বেদীতে পূজা দেয় এবং মূর্তির উদ্দেশ্যে কুরবানী করে থাকে। তার প্রতিবাদ স্বরূপ মুসলমানকে আল্লাহর জন্য ছালাত আদায়ের ও তাঁর উদ্দেশ্যে কুরবানী করার হুকুম দেওয়া হয়েছে।
আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) বলেছেন,  مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةً وَلَمْ يُضَحِّ فَلاَ يَقْرِبَنَّ مُصَلاَّنَا  ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়’। এটি ইসলামের একটি ‘মহান নিদর্শন’ যা ‘সুন্নাতে ইবরাহীম’ হিসাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে মদীনায় প্রতি বছর আদায় করেছেন এবং ছাহাবীগণও নিয়মিতভাবে কুরবানী করেছেন। অতঃপর অবিরত ধারায় মুসলিম উম্মাহ্র সামর্থ্যবানদের মধ্যে এটি চালু আছে। এটি কিতাব ও সুন্নাহ এবং ইজমায়ে উম্মত দ্বারা সুপ্রমাণিত।
তাৎপর্য :
ঈদুল আযহা ইবরাহীম (আঃ), বিবি হাজেরা ও ইসমাঈলের পরম ত্যাগের স্মৃতি বিজড়িত উৎসব। ইবরাহীম (আঃ)-কে আল-কুরআনে মুসলিম জাতির পিতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে (হজ্জ ৭৮)। এ পরিবারটি বিশ্ব মুসলিমের জন্য ত্যাগের মহত্তম আদর্শ। তাই ঈদুল আযহার দিন সমগ্র মুসলিম জাতি ইবরাহীমী সুন্নাত পালনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রাণপণ চেষ্টা করে। কুরবানীর স্মৃতিবাহী যিলহজ্জ মাসে হজ্জ উপলক্ষে সমগ্র পৃথিবী থেকে লাখ লাখ মুসলমান সমবেত হয় ইবরাহীম (আঃ)-এর স্মৃতি বিজড়িত মক্কা-মদীনায়। তাঁরা ইবরাহীমী আদর্শে আদর্শবান হওয়ার জন্য জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেন। হজ্জ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ। যা প্রতি বছরই আমাদেরকে তাওহীদী প্রেরণায় উজ্জীবিত করে। আমরা নিবিড়ভাবে অনুভব করি বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ব। ঈদের উৎসব একটি সামাজিক উৎসব, সমষ্টিগতভাবে আনন্দের অধিকারগত উৎসব। ঈদুল আযহা উৎসবের একটি অঙ্গ হচ্ছে কুরবানী। কুরবানী হ’ল চিত্তশুদ্ধির এবং পবিত্রতার মাধ্যম। এটি সামাজিক রীতি হ’লেও আল্লাহর জন্যই এ রীতি প্রবর্তিত হয়েছে। তিনিই একমাত্র বিধাতা প্রতিমুহূর্তেই যার করুণা লাভের জন্য মানুষ প্রত্যাশী। আমাদের বিত্ত, সংসার এবং সমাজ তাঁর উদ্দেশ্যেই নিবেদিত এবং কুরবানী হচ্ছে সেই নিবেদনের একটি প্রতীক।
মানুষ কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হ’তে চায়। আল্লাহর জন্য মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ত্যাগ করতে রাযী আছে কি-না সেটাই পরীক্ষার বিষয়। কুরবানী আমাদেরকে সেই পরীক্ষার কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে আল্লাহর পরীক্ষাও ছিল তাই। আমাদেরকে এখন আর পুত্র কুরবানী দেওয়ার মত কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হ’তে হয় না। একটি ‘মুসিন্নাহ’ হালাল পশু কুরবানী করেই আমরা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হ’তে পারি।
কুরবানীর ঈদ প্রসঙ্গে স্বভাবতই একটি প্রশ্ন এসে যায়। আমরা কি শুধু কুরবানীর সময়েই গরীব-দুঃখী মানুষ আহার করানোর কথা ভাবব? আর বছরের বাকি দিনগুলো কি তাদেরকে ভুলে থাকব? না, অবশ্যই না। কুরবানী একটি প্রতীকী ব্যাপার। আল্লাহর জন্য আত্মত্যাগের একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। সারা বছরই আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় নিজ সম্পদ অন্য মানুষের কল্যাণে ত্যাগ করতে হবে। এই ত্যাগের মনোভাব যদি গড়ে ওঠে। তবে বুঝতে হবে, কুরবানীর ঈদ স্বার্থক হয়েছে, কুরবানী স্বার্থক হয়েছে। নইলে এটি নামমাত্র একটি ভোগবাদী অনুষ্ঠানই থেকে যাবে চিরকাল। আল-কুরআনে আল্লাহ বারবার ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের উপার্জিত হালাল মালের কিছু অংশ এবং আমি যা তোমাদের জন্য যমীন হ’তে বের করেছি তার অংশ ব্যয় কর’ (বাক্বারাহ ২৬৭)। আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ মানবতার সেবায় ব্যয় করতে হবে। দরিদ্র মানুষের সহযোগিতায় সরকারের পাশাপাশি সকল বিত্তশালী লোককে এগিয়ে আসতে হবে। সারা বছর, সারা জীবন সাধ্যমত আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের কথা বিবেচনা করে মানুষকে সাহায্য করতে হবে। চিত্ত আর বিত্তের মিল ঘটানোর জন্যই আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বারবার মানুষকে আহবান করেছেন।
ঈদুল আযহার লক্ষ্য হচ্ছে সকলের সাথে সদ্ভাব, আন্তরিকতা এবং বিনয়-নম্র আচরণ করা। মুসলমানদের জীবনে এই সুযোগ সৃষ্টি হয় বছরে মাত্র দু’বার। ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা একই কাতারে দাঁড়িয়ে পায়ে পা এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুই রাক‘আত ছালাত আদায়ের মাধ্যমে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে যায়। পরস্পরে কুশল বিনিময় করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়, জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং আন্তরিক মহানুভবতায় পরিপূর্ণ করে। মূলতঃ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে দৈন্য, হতাশা তা দূরীকরণের জন্য ঈদুল আযহার সৃষ্টি হয়েছে। যারা অসুখী এবং দরিদ্র তাদের জীবনে সুখের প্রলেপ দেওয়া এবং দারিদ্রের কষাঘাত দূর করা সামর্থ্যবান মুসলমানদের কর্তব্য।
মানবপুত্রের কোন সৎ কর্মই আল্লাহর কাছে কুরবানীর দিনে রক্ত প্রবাহিত করার চাইতে অধিকতর প্রিয় নয়। ক্বিয়ামতের দিনে কুরবানীর পশুর শিং, লোম আর ক্ষুর সমূহ নিয়ে হাজির করা হবে। কুরবানীর রক্ত মাটি স্পর্শ করার পূর্বেই আল্লাহর কাছে তার ছওয়াব গ্রাহ্য হয়ে যায়। আল্লাহর কাছে কুরবানীর ছওয়াব গ্রাহ্য হওয়ার তাৎপর্য কি? যে অকুণ্ঠ ঈমান আর ত্যাগের মহিমায় উদ্দীপ্ত হয়ে ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ) স্বীয় প্রাণাধিক পুত্রের স্কন্ধে ছুরি উত্তোলিত করেছিলেন, কুরবানীর পশুর গলায় ছুরি দেওয়ার সময়ে ইবরাহীমের মানস সন্তানদের হৃদয়তন্ত্রী সেই ঈমান ও ত্যাগের সুরে যদি অনুরণিত না হয়ে উঠে, তাদের দেহ আর মনের পরতে পরতে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের আকুল আগ্রহ যদি উদ্বেলিত না হয়, তাহ’লে তাদের এই কুরবানীর উৎসব গোশতখুরীর পর্বেই পর্যবসিত হবে। আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কুরবানীদাতাদের সাবধান করে দিয়েছেন, ‘কুরবানীর পশুর রক্ত, গোশত কোন কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, পৌঁছে কেবল তোমাদের তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি’ (হজ্জ ৩৭)। অর্থাৎ কুরবানীদাতা যেন আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই কুরবানী করে। পরিশেষে বলতে চাই, আল্লাহর রাহে জীবন উৎসর্গ করার জাযবা সৃষ্টি করা, ইবরাহীমের পুত্র কুরবানীর ন্যায় ত্যাগ-পূত আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করা ও তাঁর বড়ত্ব প্রকাশ করাই কুরবানী প্রকৃত তাৎপর্য।
শিক্ষা :
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়, ‘তোরা ভোগের পাত্র ফেলরে ছুঁড়ে, ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ’। মানুষ আল্লাহর জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবে, এই শিক্ষাই ইবরাহীম (আঃ) আমাদের জন্য রেখে গেছেন। মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) আমাদের জন্য ঐ ত্যাগের আনুষ্ঠানিক অনুসরণকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। আর ঈদুল আযহার মূল আহবান হ’ল সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ করা। সকল দিক হ’তে মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া। সম্পদের মোহ, ভোগ-বিলাসের আকর্ষণ, সন্তানের স্নেহ, স্ত্রীর মুহাববত সবকিছুর ঊর্ধ্বে আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রতি আত্মসমর্পণ করে দেওয়াই হ’ল ঈদুল আযহার মূল শিক্ষা। স্বামী, স্ত্রী ও শিশুপুত্রের গভীর আত্মবিশ্বাস, অতলান্তিক ঈমানী প্রেরণা, আল্লাহর প্রতি নিশ্চিন্ত নির্ভরতা ও অবশেষে আল্লাহকে খুশী করার জন্য তাঁর হুকুম মোতাবেক জীবনের সর্বাধিক প্রিয় একমাত্র সন্তানকে নিজ হাতে যবহ করার কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তরণ-এসবই ছিল আল্লাহর প্রতি অটুট আনুগত্য, গভীর আল্লাহভীতি এবং নিজের তাওহীদ ও তাকওয়ার সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা। ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর হুকুমে পুত্র কুরবানী করেছিলেন। মূলতঃ তিনি এর দ্বারা পুত্রের মুহাববতকে কুরবানী করেছিলেন। আল্লাহর ভালোবাসার চাইতে যে পুত্রের ভালোবাসা বড় নয়, এটিই প্রমাণিত হয়েছে তাঁর আচরণে। আল্লাহ এটাই চেয়েছিলেন। আর এটাই হ’ল প্রকৃত তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি। ইবরাহীম (আঃ) তাঁর প্রিয়পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-কে কুরবানী করে এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যাতে অনাগত ভবিষ্যতের অগণিত মানুষ আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের বাস্তব শিক্ষা লাভ করতে পারে। প্রতি বছর যিলহজ্জ মাসে মুসলিম জাতি পশু কুরবানীর মাধ্যমে ইবরাহীম (আঃ)-এর স্মৃতি স্মরণ করে এবং পশু কুরবানীর সাথে সাথে নিজেদের পশুবৃত্তিকে কুরবানী দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে। ইসমাঈল নবীন বয়সেই বিশ্ববাসীকে আত্মসমর্পণের এক বাস্তব ও জ্বলন্ত শিক্ষা প্রদান করেন। মূলতঃ আল্লাহর রাহে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার নামই হ’ল আত্মসমর্পণ। পিতা-পুত্র আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের যে অনুপম আদর্শ স্থাপন করে গেছেন, তা যেমন অতুলনীয়, তেমনি চির অনুকরণীয়। আজকে ইবরাহীমী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পশু কুরবানীর সাথে সাথে আমাদের দৃপ্ত শপথ নিতে হবে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জান, মালসহ যেকোন ত্যাগ স্বীকার করতে আমরা প্রস্ত্তত আছি। আর এটিই হ’ল কুরবানীর শিক্ষা। এই স্বর্ণোজ্জ্বল আদর্শ যুগে যুগে বিশ্ববাসীকে বারবার এই পরম সত্যটিকেই হৃদয়ঙ্গম করাতে চেয়েছে যে, আল্লাহই একমাত্র সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, তাঁর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনই প্রকৃত মুমিনের কাজ এবং তাতেই নিহিত রয়েছে অশেষ কল্যাণ ও প্রকৃত সফলতা। ইবরাহীম (আঃ) সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করেছিলেন, হয়েছিলেন স্বয়ং আল্লাহ ঘোষিত মানবজাতির ইমাম। তিনি মানবজাতির আদর্শ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যারা আল্লাহ ও পরকালের ভয় কর তাদের জন্যে ইবরাহীম ও তাঁর অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’ (মুমতাহিনা ৪-৬)
আদম (আঃ)-এর সময় থেকেই চলে আসা কুরবানীর প্রথা পরবর্তীকালের সকল নবী-রাসূল, তাঁদের উম্মত আল্লাহর নামে, কেবল তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী করে গেছেন। এ কুরবানী কেবল পশু কুরবানী নয়। নিজের পশুত্ব, নিজের ক্ষুদ্রতা, নীচতা, স্বার্থপরতা, হীনতা, দীনতা, আমিত্ব ও অহংকার ত্যাগের কুরবানী। নিজের ছালাত, কুরবানী, জীবন-মরণ ও বিষয়-আশয় সব কিছুই কেবল আল্লাহর নামে, শুধু তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য চূড়ান্তভাবে নিয়োগ ও ত্যাগের মানস এবং বাস্তবে সেসব আমল করাই হচ্ছে প্রকৃত কুরবানী। এই কুরবানীর পশু যবেহ থেকে শুরু করে নিজের পশুত্ব যবেহ বা বিসর্জন এবং জিহাদ-কিতালের মাধ্যমে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদতবরণ পর্যন্ত সম্প্রসারিত। এই কুরবানী মানুষের তামান্না, নিয়ত, প্রস্ত্ততি, গভীরতম প্রতিশ্রুতি থেকে আরম্ভ করে তার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন পর্যন্ত সম্প্রসারিত। ঈদুল আযহার সময়, হজ্জ পালনকালে মুসলিমের পশু কুরবানী উপরোক্ত সমগ্র জীবন ও সম্পদের কুরবানীর তাওহীদী নির্দেশের অঙ্গীভূত এবং তা একই সঙ্গে আল-কুরআনে আল্লাহ কর্তৃক ঘোষিত মানব জাতির ইমাম ইবরাহীম (আঃ)-এর পুত্র কুরবানীর চরম পরীক্ষা প্রদান ও আদর্শ চেতনার প্রতীকী রূপ।
মুসলিম পরিবারের প্রতিটি মানুষেরই একমাত্র আদর্শ হবে আল্লাহর হুকুমের কাছে মানা নত না করা। বরং আল্লাহর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করাই হবে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম (আঃ) এ শিক্ষাই দিয়ে গেছেন তাঁর সন্তানদের। জনৈক উর্দূ কবি বলেন, ‘যদি আমাদের মাঝে ফের ইবরাহীমের ঈমান পয়দা হয়, তাহ’লে অগ্নির মাঝে ফের ফুলবাগানের নমুনা সৃষ্টি হ’তে পারে’। সুতরাং ইবরাহীমী ঈমান ও ইসমাঈলী আত্মত্যাগের উত্থান যদি আবার জাগ্রত হয়, তবে আধুনিক জাহেলিয়াতের গাঢ় তমিশ্রা ভেদ করে পুনরায় মানবতার বিজয় নিশান উড্ডীন হবে। সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরে আসবে। তাই কুরবানীর পশুর গলায় ছুরি দেওয়ার পূর্বে নিজেদের মধ্যে লুক্কায়িত পশুত্বের গলায় ছুরি দিতে হবে। মহান আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণকারী ও আত্মত্যাগী হ’তে হবে। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত মুমিন বা মুত্তাকী হ’তে হবে। আমাদের ছালাত, কুরবানী, জীবন-মরণ সবকিছু আল্লাহর জন্যই উৎসর্গ হৌক, ঈদুল আযহায় বিধাতার নিকট এই থাকুক প্রার্থনা। সবশেষে কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর ‘কুরবানী’ কবিতার কয়েকটি চরণ উল্লেখ করে প্রবন্ধের ইতি টানছি।
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন
ঐ খুনের খুঁটিতে কল্যাণকেতু লক্ষ্য ঐ তোরণ
আজি আল্লাহর নামে জান কোরবানে
ঈদের পূত বোধন।

Posts created 2100

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts

Begin typing your search term above and press enter to search. Press ESC to cancel.

Back To Top