আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি? এবং এটি কিভাবে কাজ করে?

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বাংলায় যাকে বলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। মানুষের যেমন কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ক্রিটিক্যাল থিংকিং এবং এনালাইসিস ক্ষমতা থাকে সেই ধরনের কিছু কিন্তু সাধারণত কম্পিউটার করতে পারার কথা নয়৷ কিন্তু কম্পিউটার ডিসিশন মেকিং এর জন্য পূর্বের ডাটা এনালাইসিস করে প্রপার ডিসিশন নেয়ার পদ্ধতিকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বলা হয়।

আমার যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তখন পূর্বের সমস্ত ডেটা কে ব্যবহার করে উক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। উদাহরণ হিসেবে যদি বলতে চাই, আমাদের শিক্ষকরাও যখন কোন ছাত্রকে ভালো বা খারাপ এই দুই ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে তখন কিন্তু তাদের হুট করে দেখেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় না।

তাদের এই সিদ্ধান্তগুলো নেয়ার আগে ছাত্র-ছাত্রীদের পূর্বের বেশকিছু পরীক্ষার রেজাল্ট, আচরণ, নৈতিক গুনাবলি ইত্যাদি পর্যালোচনা করে। পূর্বের কিছু তথ্য-উপাত্ত দ্বারা সাময়িক ভাবে বলে দেয়া যায় ছাত্রটি ভালো কিংবা খারাপ।  এই রকম তো হয়, তাইনা?

এবার একটু সূক্ষ্মভাবে যদি দেখি, ছাত্র-ছাত্রীদের গত একবছরের ডাটা পর্যালোচনা করে যে তথ্য দেয়া যায়, তার চেয়ে আরো নিখুঁত তথ্য দেয়া সম্ভব যদি ছাত্র-ছাত্রীদের বিগত পাঁচ থেকে ছয় বছরের রেজাল্ট পর্যালোচনা করা যায়।

এইজন্য বর্তমান সময়ে বহুল প্রচলিত ‘যার তথ্যভান্ডার যত বেশি সমৃদ্ধ, সে তত বেশি উন্নত করবে।’ মানুষের তো সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত ব্রেইন রয়েছে, যা কম্পিউটারের নেই। কম্পিউটার এ ধরনের জটিল চিন্তাগুলো করার জন্য ব্যবহার করে থাকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। 

আজকের পোস্টে আমরা জানার চেষ্টা করব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি? এবং এটি কিভাবে কাজ করে?

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি?

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স হচ্ছে এক প্রকার সিমুলেশন যা মেশিনে মানুষের মত করে কোন কিছু চিন্তা এবং জটিল সমস্যা সমাধান করে থাকে। এটি একই সাথে নতুন কিছু শিখতে পারে, এবং ঐ লব্দ জ্ঞান ব্যবহার করে পরবর্তী সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করতে পারে। 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের সাধারণ বিহেভিয়ার কে ‘বুদ্ধিমত্তা’ হিসেবে বিবেচিত করা হয়। কিন্তু কোন কীটপতঙ্গের আচরণকে কিন্তু ‘বুদ্ধিমত্তা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। এর কারণ কি বলতে পারেন?

Digger Wasp এর কথা একটু বলি। এরা যখন খাবার সংগ্রহ করে ফিরে তখন খাবার নিয়ে সরাসরি নিজেদের বাসস্থানের প্রবেশ করে না। প্রথমে বাসস্থানের সম্মুখে খাবারটি রেখে দেয়। এরপর বাসার মধ্যে অন্য কোনো ক্ষতিকর কিছু আছে কিনা সেটি পরীক্ষা করে। যদি দেখে যে স্থানটি অভয়ারণ্য, তারপর সে বাসস্থানে সম্মুখে রাখা খাওয়ারটি সংরক্ষণ করে।

তাহলে এখন বলুন, পতঙ্গটির কাজটি কি কোন বুদ্ধিমত্তার কাজ নাকি নিত্যনৈমিত্তিক কাজ? 

হ্যাঁ, এইজন্যই গবেষকরা কীটপতঙ্গের বিহেভিয়ার কে ‘বুদ্ধিমত্তার’ সাথে তুলনা করতে চান। বুদ্ধিমত্তা হলো নতুন কোন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়া। এখানে Digger Wasp একই কাজ বারবার করছে। কিন্তু বুদ্ধি খাটিয়ে নতুন কোন কিছু করছে না।

তেমনি মানুষের একক কোন বৈশিষ্ট্যের জন্য তাকে বুদ্ধিমান বলে স্বীকৃতি দেয়া যায় না। মেশিন লার্নিং কয়েকটা বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টিতে শেখা, যুক্তিসংগত চিন্তা, সমস্যা সমাধান, উপলব্ধি, এবং অন্যান্য ভাষা  ব্যবহার, এই কয়েকটি উপাদানের উপর নির্ভর করতে হয়।

শেখা (Learning)-

মানুষকে কোন কিছু শেখানোর যেমন অনেকগুলো পথ রয়েছে তেমনি কম্পিউটারকে শেখানোর জন্য হরেক রকম কৌশল রয়েছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে ট্রিয়াল এবং ইরর। আপনি যদি কম্পিউটার-এর সাথে খেলেন, তাহলে দেখবেন মেশিন অটোমেটিক ‘চাল’ দিতে থাকবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না চেকমেট হবে। যদি চেকমেট হয় তাহলে সে পুরো গেমপ্ল্যান’টি সেভ করে রাখবে। এভাবে প্রত্যেকটি সম্ভাব্য গেমস সংরক্ষন করে রাখবে। 

এখন কম্পিউটার উক্ত গেইমের প্রতিটি মুভ’কে সলভিং হিসেবে ধরে  নিবে। এই সমস্যা সমাধানের প্রয়োগকে বলা হয় ‘জেনারেলাইজেশন।’ জেনারেলাইজেশন এর মাধ্যমে নতুন সমস্যার সমাধান পদ্ধতির সাথে পূর্বের সংরক্ষিত সমস্যার তুলনা করে তারপর নতুন সমাধান দিয়ে থাকে। 

যুক্তিসংগত চিন্তা (Reasoning)-

যেকোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত চিন্তা করা অবশ্যই প্রয়োজন। এখন কম্পিউটার কিভাবে যুক্তিসংগত চিন্তা করবে? কম্পিউটার এটিকে দু’ভাগে করতে পারে। ডিডাকটিভ এবং ইন্ডাক্টিভ উপায়ে। ডিটেকটিভ হচ্ছে অনুমাননির্ভর যেমন ধরুন ‘হয়তো সামিউল চায়ের দোকানে নতুবা অডিটোরিয়ামে।’ এখন কম্পিউটার যেটা বুঝবে সেটা হচ্ছে প্রথম চেক করে দেখবে সামিউল কি চায়ের দোকান আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে তো উত্তর পেলে। আর যদি না থাকে তাহলে বুঝতে হবে সে অডিটরিয়ামে আছে। 

আর ইন্ডাক্টিভ উপায় হচ্ছে, আগে থেকেই কোন বিষয়টি কিভাবে চিন্তা-ভাবনা করবে সেটি নির্ধারণ করে দেওয়া। যেমন ধরুন বিজ্ঞানের কোন বিষয় যদি আগে থেকে ব্যাখ্যা করে কম্পিউটারকে বোঝানো হয়, তাহলে সে খুব সহজে ধরতে পারবে তার এই ক্ষেত্রে সমাধান কি দেওয়া উচিত। 

সমস্যা সমাধান (Problem Solving)-

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর সমস্যার সমাধান বলতে কিছু নির্দিষ্ট উপায় সার্চ করতে করতে সলিউশন খোঁজাকে পদ্ধতিকে সমস্যার সমাধান বলে। এ ধরনের সমস্যার সাধারণত দুই ভাবে করা সম্ভব। স্পেশাল পারপোজ এবং জেনারেল পারপোজ। স্পেশাল পারপোজ এর ক্ষেত্রে আগে থেকেই কোন সমস্যার সমাধানের একটি রোডম্যাপ দেয়া থাকে। যেটি ধরে সামনে এগোতে থাকলে সমস্যাটি একটা সমাধান বের করা যায়।

অপরটি হচ্ছে জেনারেল জেনারেল পারপোজ। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি পদক্ষেপ ধীরে ধীরে গ্রহণ করে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে। যেমন কোন রোবটকে প্রথমে বলা হলো, ডান দিকে যাও। তারপর বাম দিকে, উপরে, নিচে এভাবে প্রত্যেকটা দিকে বর্ণনা করে সমস্যাটির সমাধান এর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।

উপলব্ধি (Perception)-

সেলফ ড্রাইভিং কার সম্পর্কে আমরা অনেকে জানি। এই কারণগুলো সাধারণত ক্যামেরার বিশেষ সেন্সর এর মাধ্যমে কাজ করে থাকে। গাড়ির উপরে থ্রি-সিক্সটি ডিগ্রী ক্যামেরা সেটআপ করা থাকে। এই ক্যামেরাগুলো অবস্থার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে গাড়ির পরবর্তী মুভমেন্টে ভূমিকা রাখে।

তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও উপলব্ধি বিষয়টি এভাবে কাজ করা থাকে। বিভিন্ন উপায়ে তথ্য-উপাত্ত গ্রহণ করে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমস্যা সমাধান করা হয়, যা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এ ডিসিশন নিতে সহায়তা করে থাকে।

ভাষা  ব্যবহার (Using Language)-

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর ভাষা একটি বড় ধরনের ফ্যাক্টর। সেলফ ড্রাইভিং কার গুলো যখন কোন স্পেসিফিক লোকেশন এর মধ্য দিয়ে যায়, তখন সেখানকার সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ গুলো তাকে বুঝতে হয়। যেমন রাস্তায় যে ধরনের ট্রাফিক ইন্ডিকেটরগুলো দেয়া থাকে সেগুলোর মধ্যে ও স্থানীয় ভাষা ব্যবহার করা হয়। এই ভাষাগুলো যদি সিস্টেম বা মেশিন ধরতে না পারে তাহলে সে ভুল নির্দেশনা দিতে পারে। 

এছাড়াও অনেক ভাষা আছে উচ্চারণের উপর নির্ভর করে বা ভাষার গতির উপর নির্ভর করে সবকিছু পরিবর্তন হয়। তাই ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অনেক বেশি সতর্ক থাকে। যদি কোন উপায়ে ভুল উপাত্ত গ্রহণ করে, তাহলে তার পুরো ডিসিশন মেকিং-এ সেট এর প্রভাব পড়বে।

গুগলের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর চমক আমরা অনেক দেখেছি। গুগোল কিংবা সিরির কথাই ভাবুন আপনার গুগলের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট আপনার আগের কনভারসেশন এর উপর ভিত্তি করে পরবর্তী রিপ্লাই গুলো দিতে পারে। এটিও কিন্তু একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। এমনকি আপনার স্ক্রীনে কি ঘটছে সে অনুযায়ী যে কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। 

গুগলের 2020 I/O ইভেন্টে সেবার দেখিয়েছিল কিভাবে অটোমেটিক কল সেটআপ করে দেওয়া যায় নির্দিষ্ট কিছু কলের জন্য। আপনি যদি কোনো কারণে বিজি থাকেন গুগলের অটোম্যাটিক অ্যালগরিদম সেটি বুঝে নিয়ে কে কল করেছেন তার সঙ্গে কথা বলতে পারে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *