ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি (IoT) কী জিনিস?

ইন্টারনেট অফ থিংস বা  আইওটি (IoT) কী জিনিস?

Internet of Things – কে সংক্ষেপে IoT বলা হয়। এ নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে এখন। অনেকেই বলছেন, আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সবকিছুই বদলে দিতে পারে এই ‘ইন্টারনেট অফ থিংস’ বা আইওটি।

শপিং থেকে শুরু করে কোথাও ঘুরতে যাওয়া কিংবা স্টোরের মালামালের হিসাব রাখার মতো অনেক কাজই নিয়ন্ত্রণ করবে ইন্টারনেট অফ থিংস। কিন্ত এই ‘ইন্টারনেট অফ থিংস’ আসলে কাকে বলে? কীভাবে কাজ করে আইওটি? আর আসলেই এর গুরুত্ব কতটা বেশি?

ইন্টারনেট অফ থিংস কাকে বলে-

এককথায় বলতে গেলে ইন্টারনেট অফ থিংস একটা আইডিয়া। আইডিয়াটা হলো, যেকোনো ধরনের যন্ত্র বা ডিভাইসকে ইন্টারনেট এবং অন্যান্য ডিভাইসের সাথে কানেক্ট করা।

তারমানে আইওটি হচ্ছে একইসঙ্গে মানুষ ও ডিভাইস নিয়ে গড়ে ওঠা একটা বিশাল নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত ডিভাইসগুলি নিজেদের মধ্যেই ডেটা সংগ্রহ, শেয়ার ও পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী এই ডেটাগুলিকে কাজে লাগাবে।

তার মানে যেকোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইসই আইওটি’তে যুক্ত থাকতে পারে। অন্তত যেসব ডিভাইস অন-অফ করা যায়, সেগুলিই আইওটি তে যুক্ত হতে পারে। যেমন, আইওটি’তে সংযুক্ত থাকতে পারে স্মার্ট মাইক্রোওয়েভ ওভেন, যেই ডিভাইসটি কতক্ষণ কোন খাবার গরম করতে হয়, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নির্ধারণ করতে পারে। আবার এতে যুক্ত থাকতে পারে ‘সেলফ ড্রাইভিং কার’, যেগুলি ড্রাইভার ছাড়াই বুঝতে পারে রাস্তায় কোথায় কী আছে। তাছাড়া এতে ফিটনেস ডিভাইসও যুক্ত থাকতে পারে, যেগুলি ইউজারের হার্টবিট রেট বা সারাদিনে হাঁটার পরিমাণ হিসাব করে জানিয়ে দেবে তার কী পরিমাণ ব্যায়াম করা উচিত।

এমনকি ফুটবলেও এখন আইওটি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফুটবলে থাকা সেন্সর দিয়ে হিসাব করা হচ্ছে কত স্পিডে বলে কিক মারা হয়েছে অথবা বলটি কতদূর পর্যন্ত যাচ্ছে। তারপর এসব ডেটার রেকর্ড রাখা হচ্ছে খেলোয়াড়দের ট্রেইনিং এ কাজে লাগানোর জন্য।

যেভাবে কাজ করে আইওটি-

ইন্টারনেট অফ থিংস-এ যুক্ত থাকা ডিভাইসগুলির বিল্ট-ইন সেন্সর থেকে প্রাথমিক ভাবে ডেটা সংগ্রহ করা হয়। এভাবে বিভিন্ন ডিভাইস থেকে সংগ্রহ করা ডেটা আইওটি প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করা হয়। তারপর ডেটা অ্যানালাইসিস করে কোন ডেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা ঠিক করে কাজে লাগানো হয়।

এই শক্তিশালী আইওটি প্ল্যাটফর্মগুলি বুঝতে পারে কোন তথ্য বা ইনফরমেশন বেশি জরুরি আর কোনটা বাদ দেয়া যায়। এভাবে সংগ্রহ করা ইনফরমেশন বা তথ্য দিয়ে প্যাটার্ন শনাক্ত করা হয়, যাতে কোনো ক্রাইসিস বা সংকট আসার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যায়।

যেমন ধরা যাক আপনার গাড়ি বানানোর কোম্পানি আছে। এখন আপনি জানতে চান গাড়ির কোন পার্টসটি বেশি জনপ্রিয়। হতে পারে সেটা গাড়ির সিট বা চাকার রিম। এখানে ইন্টারনেট অফ থিংস আপনি যেভাবে কাজে লাগাতে পারেন-

  • আপনি দেখতে পারেন শো রুমের কোথায় বেশি মানুষের ভিড় থাকে বা কোন জায়গায় ক্রেতারা বেশি সময় কাটায়
  • সেলস ডেটা থেকে দেখতে পারেন কোন পার্টসের বিক্রি বেশি
  • সেলস ডেটা অনুযায়ী সাপ্লাই চেইন ঠিক করতে পারেন, যাতে বেশি বিক্রি হওয়া আইটেমগুলির স্টক শেষ না হয়

এভাবে আইওটির সাথে কানেক্টেড ডিভাইস থেকে পাওয়া ডেটা ব্যবহার করে কী কী পণ্য স্টক করতে হবে, সেই ব্যাপারে আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আর সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যে আপনার খুব বেশি সময়ও লাগবে না। ফলে আপনার সময় ও টাকা দুইই বাঁচবে।

আইওটির আরও আধুনিক অ্যানালিটিকস কাজে লাগিয়ে ব্যবসার নানান ধরনের কাজ আরো দক্ষতার সাথে করা সম্ভব হবে। যেমন, অনেক ধরনের স্মার্ট অবজেক্ট বা সিস্টেম দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অনেক কাজ করা যায়। বিশেষ করে এমন সব কাজ, যেগুলি একঘেয়ে, বার বার করা লাগে বা যেসব কাজ করতে বেশি সময় যায়, সেগুলি সহজেই করা যায়।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আইওটি কীভাবে কাজে লাগবে, তার উদাহরণ দেখে নেয়া যাক এবার।

বাসাবাড়িতে আইওটির ব্যবহার-

ধরা যাক, আপনি প্রতিদিনই ভোর ৭টায় উঠে কাজে যান। আপনার সাধারণ অ্যালার্ম ঘড়ি সময় মতো আপনার ঘুম ভাঙায়। কিন্ত একদিন কোনো এক কারণে যে ট্রেন বা পরিবহনে আপনি অফিসে যান, সেটা ক্যান্সেল হয়ে গেল। আপনাকে অফিস যেতে হলে এখন নিজের গাড়ি নিয়ে বের হতে হবে। সমস্যা হচ্ছে, গাড়ি চালিয়ে যেতে হলে জ্যামের কারণে আপনার বেশি সময় লাগবে এবং সেজন্য ঘুম থেকে আপনাকে কমপক্ষে সাড়ে ৬টায় উঠতে হবে।

০আবার দেখা গেল, ওইদিন মুষলধারে বৃষ্টিও হচ্ছে। তার মানে আপনি চাইলেও জোরে গাড়ি চালাতে পারবেন না। যদি আপনার অ্যালার্ম ঘড়ি আইওটি’র সঙ্গে যুক্ত থাকতো, তাহলে সেই স্মার্ট অ্যালার্ম ঘড়ি সকল বিষয় বিবেচনায় এনে আপনাকে ঠিক সময়েই ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতো। অনলাইনে থাকা তথ্য অনুসারে ঘড়ি নিজেই বুঝতে পারতো যে, আজকে ট্রেন ক্যানসেল হয়েছে। তখন গাড়িতে করে আপনার যেতে কতক্ষণ সময় লাগবে, সেটাও বের করে ফেলতো। আবহাওয়ার আপডেট থেকে আরও বের করে ফেলতো, এই বৃষ্টিতে আপনার অ্যাভারেজ স্পিড কত হতে পারে। এসব হিসাব করেই স্মার্ট অ্যালার্ম ঘড়ি আপনাকে সাড়ে ৬টায় ঘুম থেকে ডেকে তুলতো। এটিই হচ্ছে সুপার স্মার্ট আইওটি। এমনকি চাইলে অ্যালার্ম ক্লকের সাথে আপনার কফি মেকারও সংযুক্ত করে রাখতে পারবেন, যাতে ঘুম থেকে উঠেই আপনার মগে কফি রেডি থাকে।

যানবাহনে আইওটির ব্যবহার-

ধরা যাক, এবার আপনার স্মার্ট অ্যালার্ম ক্লক আপনাকে সময় মতোই সকালে উঠিয়ে দিয়েছে। এখন আপনি গাড়ি চালিয়ে অফিস যাচ্ছেন। হঠাৎ আপনার ইঞ্জিন লাইট জ্বলে উঠলো। কারণ একটা গড়বড় দেখা দিয়েছে ইঞ্জিনে। অন্য সময় হলে হয়তো গাড়িটা গ্যারেজে নিয়ে যেতেন, কিন্ত আজ অফিসে তাড়া আছে। বেশ ঝামেলায় পড়ে গেলেন। এখন গাড়িতে যদি আইওটি কানেক্টেড থাকতো, তাহলে ইঞ্জিন লাইট জ্বলার সাথে সাথে সেটা আইওটিতে কানেক্টেড থাকা অন্য ডিভাইসগুলিও জেনে যেতো।

‘ডায়াগনস্টিক বাস’ নামের একটা সিস্টেমের মাধ্যমে সেন্সর থেকে এই ডেটাগুলি সংগ্রহ করে গাড়ির গেটওয়েতে পার করে দেয়া হতো। সেখান থেকে ডেটা চলে যেতো গাড়ির কোম্পানির প্ল্যাটফর্মে। কোম্পানি তখন সেই ডেটা দেখে আপনাকে ফিডব্যাক দিতো। ফলে কাছাকাছি কোথায় গাড়ি ঠিক করার গ্যারেজ রয়েছে, সেটা তৎক্ষণাৎ জানা হয়ে যেতো আপনার। এছাড়াও আপনার সময় বাঁচাতে গ্যারেজে আপনার অ্যাপয়েনমেন্ট ঠিক করে রাখা কিংবা গাড়ির পার্টস রিপ্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ার মতো নানান ধরনের কাজ আইওটি কানেক্টেড ডিভাইস আগে থেকেই করে রাখতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *